Thursday, August 13, 2015

আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে;
          পাকে পাকে ফেরে ফেরে
        আমার জীবন দিয়ে জড়ায়েছি এরে;
              প্রভাত-সন্ধ্যার
              আলো-অন্ধকার
          মোর চেতনায় গেছে ভেসে;
               অবশেষে
     এক হয়ে গেছে আজ আমার জীবন
          আর আমার ভুবন।
     ভালোবাসিয়াছি এই জগতের আলো
          জীবনেরে তাই বাসি ভালো।
 
     তবুও মরিতে হবে এও সত্য জানি।
              মোর বাণী
     একদিন এ-বাতাসে ফুটিবে না,
     মোর আঁখি এ-আলোকে লুটিবে না,
              মোর হিয়া ছুটিবে না
              অরুণের উদ্দীপ্ত আহ্বানে;
                       মোর কানে কানে
          রজনী কবে না তার রহস্যবারতা,
     শেষ করে যেতে হবে শেষ দৃষ্টি, মোর শেষ কথা।
 
              এমন একান্ত করে চাওয়া
                    এও সত্য যত
              এমন একান্ত ছেড়ে যাওয়া
                    সেও সেই মতো।
     এ দুয়ের মাঝে তবু কোনোখানে আছে কোনো মিল;
                            নহিলে নিখিল
                    এতবড়ো নিদারুণ প্রবঞ্চনা
     হাসিমুখে এতকাল কিছুতে বহিতে পারিত না।
                            সব তার আলো
     কীটে-কাটা পুষ্পসম এতদিনে হয়ে যেত কালো।

তুমি কি কেবল ছবি শুধু পটে লিখা।
     ওই যে সুদূর নীহারিকা
       যারা করে আছে ভিড়
          আকাশের নীড়;
     ওই যে যারা দিনরাত্রি
অলো-হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী
          গ্রহ তারা রবি
তুমি কি তাদেরি মতো সত্য নও।
     হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি।
 
চিরচঞ্চলের মাঝে তুমি কেন শান্ত হয়ে রও।
          পথিকের সঙ্গ লও
     ওগো পথহীন।
          কেন রাত্রিদিন
সকলের মাঝে থেকে সবা হতে আছ এত দূরে
     স্থিরতার চির অন্তঃপুরে।
          এই ধূলি
     ধূসর অঞ্চল তুলি
         বায়ুভরে ধায় দিকে দিকে;
বৈশাখে সে বিধবার আভরণ খুলি
     তপস্বিনী ধরণীরে সাজায় গৈরিকে;
         অঙ্গে তার পত্রলিখা দেয় লিখে
          বসন্তের মিলন-উষায়,
         এই ধূলি এও সত্য হায়;
             এই তৃণ
         বিশ্বের চরণতলে লীন
এরা যে অস্থির, তাই এরা সত্য সবি--
          তুমি স্থির, তুমি ছবি,
              তুমি শুধু ছবি।
 
একদিন এই পথে চলেছিলে আমাদের পাশে।
     বক্ষ তব দুলিত নিশ্বাসে;
          অঙ্গে অঙ্গে প্রাণ তব
          কত গানে কত নাচে
             রচিয়াছে
          আপনার ছন্দ নব নব
       বিশ্বতালে রেখে তাল;
     সে যে আজ হল কত কাল।
          এ জীবনে
         আমার ভুবনে
          কত সত্য ছিলে।
         মোর চক্ষে এ নিখিলে
       দিকে দিকে তুমিই লিখিলে
     রূপের তুলিকা ধরি রসের মুরতি।
সে-প্রভাতে তুমিই তো ছিলে
     এ-বিশ্বের বাণী মূর্তিমতী।
 
একসাথে পথে যেতে যেতে
    রজনীর আড়ালেতে
     তুমি গেলে থামি।
    তার পরে আমি
     কত দুঃখে সুখে
    রাত্রিদিন চলেছি সম্মুখে।
চলেছে জোয়ার-ভাঁটা আলোকে আঁধারে
     আকাশ-পাথারে;
          পথের দুধারে
     চলেছে ফুলের দল নীরব চরণে
          বরনে বরনে;
সহস্রধারায় ছোটে দুরন্ত জীবন-নির্ঝরিণী
     মরণের বাজায়ে কিঙ্কিণী।
          অজানার সুরে
     চলিয়াছি দূর হতে দূরে--
          মেতেছি পথের প্রেমে।
 
          তুমি পথ হতে নেমে
              যেখানে দাঁড়ালে
                     সেখানেই আছ থেমে।
এই তৃণ, এই ধূলি-- ওই তারা, ওই শশী-রবি
                   সবার আড়ালে
          তুমি ছবি, তুমি শুধু ছবি।
 
          কী প্রলাপ কহে কবি।
              তুমি ছবি?
নহে নহে, নও শুধু ছবি।
     কে বলে রয়েছ স্থির রেখার বন্ধনে
          নিস্তব্ধ ক্রন্দনে।
     মরি মরি, সে আনন্দ থেমে যেত যদি
              এই নদী
          হারাত তরঙ্গবেগ,
              এই মেঘ
     মুছিয়া ফেলিত তার সোনার লিখন।
          তোমার চিকন
চিকুরের ছায়াখানি বিশ্ব হতে যদি মিলাইত
              তবে
            একদিন কবে
          চঞ্চল পবনে লীলায়িত
      মর্মর-মুখর ছায়া মাধবী-বনের
             হত স্বপনের।
     তোমায় কি গিয়েছিনু ভুলে।
তুমি যে নিয়েছ বাসা জীবনের মূলে
              তাই ভুল।
অন্যমনে চলি পথে, ভুলি নে কি ফুল।
          ভুলি নে কি তারা।
 
              তবুও তাহারা
          প্রাণের নিশ্বাসবায়ু করে সুমধুর,
     ভুলের শূন্যতা-মাঝে ভরি দেয় সুর।
          ভুলে থাকা নয় সে তো ভোলা;
বিস্মৃতির মর্মে বসি রক্তে মোর দিয়েছ যে দোলা।
          নয়নসম্মুখে তুমি নাই,
     নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই;
              আজি তাই
     শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
              আমার নিখিল
     তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
          নাহি জানি, কেহ নাহি জানে
          তব সুর বাজে মোর গানে;
              কবির অন্তরে তুমি কবি,
     নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।
     তোমারে পেয়েছি কোন্‌ প্রাতে,
          তার পরে হারায়েছি রাতে।
   তার পরে অন্ধকারে অগোচরে তোমারেই লভি।
          নও ছবি, নও তুমি ছবি।
 


যৌবন রে, তুই কি রবি সুখের খাঁচাতে।
     তুই যে পারিস কাঁটাগাছের উচ্চ ডালের 'পরে
                    পুচ্ছ নাচাতে।
     তুই পথহীন সাগরপারের পান্থ,
     তোর ডানা যে অশান্ত অক্লান্ত,
          অজানা তোর বাসার সন্ধানে রে
              অবাধ যে তোর ধাওয়া;
          ঝড়ের থেকে বজ্রকে নেয় কেড়ে
              তোর যে দাবিদাওয়া।
 
যৌবন রে, তুই কি কাঙাল, আয়ুর ভিখারী।
     মরণ-বনের অন্ধকারে গহন কাঁটাপথে
                    তুই যে শিকারি।
     মৃত্যু যে তার পাত্রে বহন করে
     অমৃতরস নিত্য তোমার তরে;
          বসে আছে মানিনী তোর প্রিয়া
              মরণ-ঘোমটা টানি।
          সেই আবরণ দেখ্‌ রে উতারিয়া
              মুগ্ধ সে মুখখানি।
 
যৌবন রে, রয়েছ কোন্‌ তানের সাধনে।
     তোমার বাণী শুষ্ক পাতায় রয় কি কভু বাঁধা
                     পুঁথির বাঁধনে।
     তোমার বাণী দখিন হাওয়ার বীণায়
     অরণ্যেরে আপনাকে তার চিনায়,
          তোমার বাণী জাগে প্রলয়মেঘে
              ঝড়ের ঝংকারে;
     ঢেউয়ের 'পরে বাজিয়ে চলে বেগে
          বিজয়-ডঙ্কা রে।
 
যৌবন রে, বন্দী কি তুই আপন গণ্ডিতে।
     বয়সের এই মায়াজালের বাঁধনখানা তোরে
          হবে খণ্ডিতে।
     খড়গসম তোমার দীপ্ত শিখা
     ছিন্ন করুক জরার কুজ্‌ঝটিকা,
     জীর্ণতারি বক্ষ দু-ফাঁক ক'রে
              অমর পুষ্প তব
     আলোকপানে লোকে লোকান্তরে
              ফুটুক নিত্য নব।
 
যৌবন রে, তুই কি হবি ধুলায় লুণ্ঠিত।
     আবর্জনার বোঝা মাথায় আপন গ্লানিভারে
                         রইবি কুণ্ঠিত?
     প্রভাত যে তার সোনার মুকুটখানি
     তোমার তরে প্রত্যুষে দেয় আনি,
          আগুন আছে ঊর্ধ্ব শিখা জ্বেলে
              তোমার সে যে কবি।
          সূর্য তোমার মুখে নয়ন মেলে
              দেখে আপন ছবি।
 
 কবিতার নামঃ যৌবন রে, তুই কি রবি সুখের খাঁচাতে  
কাব্যগ্রন্থ্যঃ বলাকা
 শান্তিনিকেতন, ৪ চৈত্র, ১৩২২


যে-কথা বলিতে চাই,
         বলা হয় নাই,
             সে কেবল এই--
চিরদিবসের বিশ্ব আঁখিসম্মুখেই
             দেখিনু সহস্রবার
             দুয়ারে আমার।
     অপরিচিতের এই চির পরিচয়
এতই সহজে নিত্য ভরিয়াছে গভীর হৃদয়
     সে-কথা বলিতে পারি এমন সরল বাণী
          আমি নাহি জানি।
 
শূন্য প্রান্তরের গান বাজে ওই একা ছায়াবটে;
     নদীর এপারে ঢালু তটে
          চাষি করিতেছে চাষ;
     উড়ে চলিয়াছে হাঁস
ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য বালুতীরতলে।
          চলে কি না চলে
        ক্লান্তস্রোত শীর্ণ নদী, নিমেষ-নিহত
          আধো-জাগা নয়নের মতো।
          পথখানি বাঁকা
     বহুশত বরষের পদচিহ্ন-আঁকা
চলেছে মাঠের ধারে, ফসল-খেতের যেন মিতা,
     নদীসাথে কুটিরের বহে কুটুম্বিতা।
 
ফাল্গুনের এ-আলোয় এই গ্রাম, ওই শূন্য মাঠ,
              ওই খেয়াঘাট,
ওই নীল নদীরেখা, ওই দূর বালুকার কোলে
      নিভৃত জলের ধারে চখাচখি কাকলি-কল্লোলে
          যেখানে বসায় মেলা-- এই সব ছবি
              কতদিন দেখিয়াছে কবি।
শুধু এই চেয়ে দেখা, এই পথ বেয়ে চলে যাওয়া,
     এই আলো, এই হাওয়া,
এইমতো অস্ফুটধ্বনির গুঞ্জরণ,
     ভেসে-যাওয়া মেঘ হতে
     অকস্মাৎ নদীস্রোতে
          ছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ,
যে আনন্দ-বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস
          হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারি প্রকাশ।
 
 
কবিতার নামঃ যে-কথা বলিতে চাই 
পদ্মা, ৮ ফাল্গুন, ১৩২